Posts

Showing posts from December, 2023

মঙ্গলকাব্যে তৎকালীন সমাজজীবন

 মঙ্গল কাব্য মঙ্গলস,চক গান, ব্রতকথা ও লোককাহিনী যখন কাব্যাকারে লিখিত হল তখন তার সাধারণ পরিচয় হল মঙ্গলকাব্য । ঠিক কবে থেকে এই লিখিত রূপের আবির্ভাব ঘটেছিল তা জানা যায় না। পঞ্চদশ শতক থেকে তার সাক্ষাৎ মেলে। সতরাং আশা করা যেতে পারে, আরও দু-একশ বছর আগে থেকেই এর প্রস্তুতিপর্ব অথবা কৈশোর কাল দেখা দিয়েছিল। বিশেষ, তার্কী আক্রমণের ফলশ্রুতিতেই অপৌরাণিক ও পৌরাণিক দেবদেবীর মিলন সম্ভব হয়েছিল এবং মঙ্গলকাব্য এই নবসৃষ্ট দেবদেবীরই বন্দনাগান। ফলত, ত্রয়োদশ শতকেই তার সূচনা হওয়া সম্ভব। লক্ষণীয়, মঙ্গল- কাব্যের আখ্যানের কাঠামো সন্দের অতীত থেকেই গ্রামীণ সমাজে মৌখিক সাহিত্যে প্রচলিত ছিল। তারই নব রূপান্তর, সম্প্রসারণ ও লিখিতরূপে পাওয়া গেল মঙ্গল- কাব্যকাহিনীতে।   মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীদের প্রাথমিক রূপ অশিক্ষিত জনের ভয়-ভক্তি-সংস্কার- বিশ্বাসে সষ্ট। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, হিংস্র জন্তুর আক্রমণ ও রোগভীতি এই সৃষ্টির মলে কাজ করেছিল। বাংলায় আর্য আগমনের আগেই বাঙালীরা এই দেবদেবী রূপের কল্পনা করে। ফলত, এই দেবদেবীগুলি সভ্য সমাজের মার্জিত রুচির দেবতা নন; ক্রোধ ও প্রতিহিংসাপ্রবৃত্তির মানষী দুর্বলতা দিয়ে গড়া তাঁ...

বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস :

  বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাস : কবিখ্যাতিতে চণ্ডীদাস বিদ্যাপতির সঙ্গেই তুলনীয়, যদিও উভয়ের কাব্যরীতিতে কোনো মিল নাই। বিদ্যাপতির কবিতায় নাগরিক ঐশ্বর্য – ছন্দ, অলংকার ভাষা- চাতুর্যের সমাবেশ এবং তা সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রের নিয়ম মেনে। চণ্ডীদাসের কবিতায় কাব্যকথা নির্মাণে কোনো সচেতন প্রয়াস নাই। প্রাচীন কাব্য-রীতির পর্যায় পরম্পরাও তাই সেখানে নাই। হৃদয়োৎসারিত মর্ম বেদনা সেখানে ভাষা পেয়েছে যেন অনায়াস চেষ্টায়, কেবল একান্ত আন্তরিকতায়। গভীরতা তার আশ্রয়, ভাষার সহজ সরলতাই মার্জিত ঐশ্বর্য। বিদ্যাপতির কবিতার মতো পাণ্ডিত্য সেখানে প্রকাশিত নয়, ভাব-গভীরতার মধ্যে অদৃশ্যে। প্রেমে ও মিলনে বিদ্যাপতির কবিতায় সখের উল্লাস, চণ্ডীদাসের কবিতায় কেবল-ই আর্তি, বিষাদ ও বেদনা। পূর্বেরাগ, আক্ষেপান রাগ ও ভাবসম্মিলনের পদে বিদ্যাপতি অনন্য। যদি আলংকারিক অননুশাসন কাব্যবিচারের মাপকাঠি হয় বিদ্যাপতি অদ্বিতীয় কবি। কিন্তু হৃদয়ের মিস্টিক ব্যঞ্জনার বিচারে চ'ডীদাস দ্বিতীয়-রহিত। তাঁর কবিতায় প্রেম হয়েছে সাধনা এবং দঃখ তার অনযেঙ্গ । শিব - কাঙ্ক্ষিতা উমা অপর্ণার মতোই তাঁর রাধার প্রেম তপস্যা । কবি নিজেই বলেছে...

বড়ু চণ্ডীদাস ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন

  বড়ু চণ্ডীদাস ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতা বড়, চণ্ডীদাস। বাংলাভাষায় কৃষ্ণকথা নিয়ে রচিত প্রথম কাব্য 'শ্রীকৃষ্ণকীৰ্ত্তন'। "শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তনের মূলে পথি পাওয়া যায়নি, অনলিখিত যে একটিমাত্র পাখি আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়েছে তা-ও খণ্ডিত—আদি এবং অন্ত ও মধ্যের কয়েকটি পাতা নাই। তেরটি খণ্ডে বিভক্ত এই কাব্যের খণ্ডিত সহ মোট চারশ আঠারটি পদ বা গান পাওয়া গেছে। প্রতিটি পদের উপরে রাগের উল্লেখ আছে। মুখ্য চরিত্র তিনটি—কাষ্ণ, রাধা ও বড়াই। গৌণ চরিত্রও তিনটি—যশোদা, আয়ান ঘোষ ও তার মা। কাহিনীর বিস্তার কৃষ্ণ-রাধার জন্ম থেকে কৃষ্ণের দ্বারকায় গমনহেত, রাধাবিরহ পর্যন্ত বিস্তৃত। মূখ্য তিন চরিত্রের গতিবদ্ধ কথোপকথনের মাধ্যমে কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। সেজন্যে কাব্যটিকে অনেকে নাট্যগীতির মর্যাদা দান করেন। - বড় চণ্ডীদাস ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ। তিনি কাহিনীসূত্রের সন্ধান করেছেন ভাগবত, হরিবংশ ইত্যাদি পরোণ ও জয়দেব রচিত 'গীতগোবিন্দে'র মধ্যে। কিন্তু শখে, সেগুলির উপর নির্ভর না করে তিনি প্রচলিত লোককথা, লোকগাথাকেও কাহিনীতে গ্রহণ করেছেন; বরং একট, অধিক পরিমাণে। ফলত বড়, চণ্ডীদাসের কৃষ্ণ ...

তুর্কি-বিজয় বাঙালি সমাজে কী প্রভাব ফেলেছিল‌ আলােচনা করাে

তুর্কী বিজয় ও তার ফলশ্রুতি   ত্রয়োদশ শতকের শরতেই মহম্মদ বখতিয়ার খিলজির 'নদীয়া' জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে তুর্কী শাসন প্রতিষ্ঠিত হল। ইতিপূর্বে আর্যাবর্তের অন্য অংশে শিক হণে দল পাঠান মোগলে'র প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলা দেশ ব্যতিক্রম হিসাবেই আপন স্বাধীনতা অক্ষর রাখতে সমর্থ হয়েছিল। ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনৈক শেখ লক্ষ্মণ সেনের সভাসদ হলেও ইসলাম ধর্ম বাংলাদেশে প্রচার অথবা প্রসার লাভ করেনি। তর্ক বিজয় আর্যভবনের পরে বাংলা দেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে এক বিরাট রূপান্তরের সচেনা করল, যা কেবল আর্য ও ইংরেজ আগমনের প্রভাবের সঙ্গেই তালনীয়।   তুর্কী আক্রমণের সামগ্রিক ফলাফল বিচার করে তুর্কী আমলকে 'তামস গ' (The Dark Age) নামে অভিহিত করা হয়েছে। বস্তুতে শাসককালের অন্তর্নিহিত বন্দ। পারস্পরিক হত্যালীলা, নৃশংসতা, ধর্মান্ধতা, পরধর্ম বিদ্বেষ এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির চিহ্ন লিকে নিশ্চিহ্ন করার উদগ্র প্রবৃত্তি সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতির উপর যে আঘাত হেনেছিল তাতে বাংলার জীবন-আকাশ পূর্ণ তমসাবৃতই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কালক্রমে এই দঃনের দিনগুলি অতিক্রান্ত হয়ে নবযুগের ঊষাকিরণপাতও সম্ভব হয়েছিল। 'রাত্র...

চর্যাপদে চিত্রিত সমাজচিত্র :

 চর্যাপদে চিত্রিত সমাজচিত্র : নদীমাতৃক বাংলার চারদিকে খালবিল, 'বাম দাহিন জো খালবিখলা'। তাছাড়া কোথাও কোথাও আছে 'উচা উচা পাবত'। সেখানে বাস করে অস্পৃশ্য শবর জাতি। তাদের 'হাঁড়ীত ভাত নাহি। তব, বাঙালী চিরকালই অতিথি পরায়ণ। সেজন্যই আছে নিত্য অতিথি সমাগম — "নিতি আবেশী। বাঙালীর প্রধান খাদ্য ধান যখন পাকে আনন্দের সীমা থাকে না বাঙালীর মনে- 'কঙ্গ চিনা পাবেনা রে শবর শবরী মালো'। আনন্দ প্রকাশের উপায় নাচ-গান-বাজনা - নাচন্তি বাজিল গান্তি "দেবী। সাজসজ্জাতেও বাঙালীর বড় অন রাগ। বস্ত্রের উপকরণ কাপাস তুলার অভাব নেই –‘কড় এবেরে কপাস, ফাটিলা। জীবিকার জন্য ব্রাহ্মণদের চিন্তা কম। তাম্রশাসন ('শাসনপড়া) দ্বারা রাজা তাদের নিষ্কর জমি ভোগের সুযোগ দেন। হরি, ব্রহ্মা, আগম-পথিপাঠ নিয়ে কাটে তাদের সময়। কিন্তু আছে চোর ডাকাতের ভয়—'অদঅ বঙ্গালে লড়িউ, 'চৌকড়ি ভাণ্ডার মোর লইআ সেস। ডাকাত ছাড়া আছে চোর—'কানেট চোরে নিল অধরাতী'। অবশ্য চোর ডাকাতের উপদ্রব থেকে রক্ষা -করতে ছিল প্রহরী 'তথতা পহারী'। তালাচাবিরও ব্যবস্থা ছিল- 'কোণ্ডা ভাল'। আর ছিল দারোগা—'...

বাংলা সাহিত্যের আদি যুগ (চর্যাপদ)

  বাংলা সাহিত্যের আদি যুগ   চর্যাপদ : বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যা অর্থ আচরণ। চর্যাপদ বা গানগুলির মাধ্যমে সহজযান (মহাযান বৌদ্ধধর্মে'র শাখা বজ্রযানের অন্যতর শাখা ) মতাবলম্বী গরুরা অর্থ-গোপনীয়তার সাহায্যে নিজ সম্প্রদায়ের শিষ্যদের কাছে আচরণ বা সাধন-উপায় ব্যক্ত করেছেন। অর্থের গোপনীয়তার কারণ ব্রাহ্মণ ইত্যাদি বিধর্মীদের সাধন পদ্ধতি জানানোয় অনীহা। চর্যাগান সাধন সংগীত। এতে আছে বৌদ্ধ সহজিয়াদের ভাবধারা ও যোগসাধনারা পরিচয়। বাংলা ভাষা তখন সৃজ্যমান। সেই অপরিণত ভাষাস্তরে শৌরসেনী ও মাগধী অপভ্রংশের ছাপ আছে ভাষায়। তার উপর 'সন্ধ্যাভাষা' নামে একটি রহস্যময় হেয়ালিপূর্ণ ভাষায় গানগুলি রচিত। সুতরাং গানগুলির অর্থ সহজে উদ্ধার সম্ভব নয়, অথবা সে-ভাষা আমাদের পরিচিত বাংলাভাষাও নয়। তবু বাংলা সাহিত্যের এই আদিস্তরে বাংলা ভাষার আদির পটি মার্ত হয়েছে চর্যাগানে। চর্যাগীতির একটি সংকলন 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়'। মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজের পথিশালা থেকে এটি আবিষ্কার করেন ১৯০৭ খ্রীস্টাব্দে। সংকলনটি একটি অনলিখিত পথি। সম্ভবত চতুর্দশ শতকে এটি নকল করা হয়। ...

বাঙালী জাতি ও বাংলা ভাষার উদ্ভব

Image
 বাঙালী জাতি ও বাংলা ভাষার উদ্ভবOrigin of Bengali race and Bengali language In Bengali বঙ্গ নাম 'গঙ্গাহৃদি বঙ্গভূমি' । উত্তরে তার হিমালয়, পূর্বে ও পশ্চিমে কঠিন শৈলভূমি, দক্ষিণে সমুদ্রে মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ শ্যামল সমতলভূমি বঙ্গদেশ নামে খ্যাত । ঐতরেয় ব্রাহ্মণেও আছে, কিন্তু প্রাচীন যগে সমগ্র বাংলা দেশের নাম বঙ্গ ছিল না; বস্তুত কোনো বিশিষ্ট নামেই বর্তমান ভৌগোলিক সীমাটি পরিচিত ছিল না। বঙ্গ, পাণ্ড্র, বরেন্দ্র, রাঢ় ইত্যাদি নামে এক একটি জনপদ বা অঞ্চল অভিহিত হত। মাসলমান আমলেই 'সবা বাংলা' অথবা 'বাঙ্গালা' নামে সমগ্র প্রদেশটি পরিচিত হল । পর্তুগীজদের কাছে ফারসী 'বঙ্গালহ' একট, বিকৃত হয়ে দাঁড়াল 'বেঙ্গলা', যার থেকে ইংরেজরা 'বেঙ্গল' নামটি খাঁজে পেল। একাদশ-দ্বাদশ শতক থেকে 'গৌড়' নামেও -অবশ্য দেশটি অভিহিত হত। জাতি : কোন সন্দেরে কালে বাংলায় মনষ্য বসতির সচেনা হয় সে সম্পর্কে নিশ্চিতরূপে কিছু জানা যায় না। বাংলার ইতিহাস চতুর্থ দশকের আগে রচিত হয় নি। ত কিছ, সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে, যার থেকে অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে সভ্যতার আদিযুগেও বাংলা দেশে জনবসতি ছ...