বাংলা সাহিত্যে চৈতন্যদেবের প্রভাব

 

বাংলা সাহিত্যে চৈতন্যদেবের প্রভাব

বাঙালীর ধর্মে-কর্মে মননে চৈতন্য এনেছিলেন নবজাগরণ। একটি নির্জিত জাতি তার কাঙ্ক্ষিত প্রেরণা লাভ করল চৈতন্যের আবির্ভাবে। জীবনাচরণে ও ধর্মের আচারসর্ব তার পরিবর্তে দেখা দিল হৃদয়ান ভূতি। অন ভবের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ চিরকালই তো সাহিত্য। বাংলা সাহিত্য তাই চৈতন্য জীবনী ও বাণীতে নবরসে উজ্জীবিত হল ।

মঙ্গলকাব্যগুলির গতান,গতিক ধারায়, ক.ফপ্রেম-আখ্যানে অথবা রামায়ণ-মহাভারত ইত্যাদি পরাণ-অন বাদে উন্নত সাহিত্যিক গুণাবলীর অভাব ছিল চৈতন্যপূর্ব যুগে । চৈতন্যের সমকালে এবং পরবর্তী তিনশ' বছরে পণ্ডিত ও রসজ্ঞ ব্যক্তিরা সাহিত্য- সেবায় অগ্রসর হলে ভাষার গাম্ভীর্য ও প্রকাশলাবণ্যে পূর্বেবর্তী সাহিত্য-উপাদান শ্রেষ্ঠ সাহিত্যে উন্নীত হল। চৈতন্য চরিত্রের প্রভাব তখন নায়ক চরিত্রে, চৈতন্যধর্মে'র প্রভাব ঘটনা সন্নিবেশে। কৃত্তিবাস, মকুন্দরাম অথবা নারায়ণদেব, মধ্যযুগের সব শ্রেষ্ঠ কবিই বৈষ্ণবধর্ম' দ্বারা প্রভাবিত হয়ে চরিত্র-নির্মাণ করেছেন, ঘটনা সন্নিবেশিত করেছেন তাঁদের কাব্যে, যা ভক্তির প্রকাশ বা বৈষ্ণবীয় চিন্তারই নামান্তর। কৃত্তিবাস চিত্রিত তরণীসেন রামভক্ত, কিন্তু তার ভক্তির প্রকাশ বৈষ্ণব রীতিরই অনুগামী। সর্বোপরি, চৈতন্য-অননুসারীদের চেষ্টায় তৎসম শব্দবহুল বাংলাভাষা তখন শ্রেষ্ঠ সাহিত্য রচনার উপযোগী। বৈষ্ণব কবিরা শ্রীমদ্ভাগবত অনুবাদ করেছেন, সংস্কৃতে সাহিত্যের অনুসরণে বাংলায় কাব্য রচনা করতে গিয়ে তৎসম শব্দবাহুল্যে প্রচলিত সাহিত্যধারাকে তাঁরা যথেষ্ট সমৃদ্ধ করেছেন। ধর্মমঙ্গল কাব্য ভাগবতের আদর্শেই রচিত। রামচন্দ্র ও কৃষ্ণ, বিষ্ণুর অবতার রূপে পরিচিত হওয়ায় রামায়ণ-মহাভারত ও বিষ্ণু পরাণের সঙ্গে বাঙালীর একটি অচ্ছেদ্য সম্বন্ধও স্থাপিত হয়।

চৈতন্যের বাণী, 'কলিযুগে ধর্ম হয় নাম-সংকীর্তন। তিনি ও তাঁর অন, চরবন্দ নাম সংকীর্তনকে সাধনা রূপে গ্রহণ করায় বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের বিকাশ সম্ভব হল। চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখ শ্রেষ্ঠ পদরচয়িতারা চৈতন্যধর্মকে আশ্রয় করেই বাংলা সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছেন। ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ এই তিনশ' বছর ধরে বাংলা সাহিত্যের একটি মূখ্যে ধারা বৈষ্ণবপদাবলী সাহিত্য।

এতদিন দেবতাই ছিলেন বাংলা সাহিত্যে উপজীব্য। চৈতন্যের দেবোপম চরিত্রকে উপলক্ষ করে মানব দেবতার আসন গ্রহণ করল। রচিত হল 'গৌরচন্দ্রিকা'- রাধাকৃষ্ণে প্রণয়লীলার অনুসরণে গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ।

গোবিন্দ দাসের অনবদ্য পদাবলীর অনেকগুলিই গৌরাঙ্গ বিষয়ক অথবা 'গৌরচন্দ্রিকা'র পদ। চৈতন্য যেহেত, 'অন্তঃকৃষ্ণ বহি'গৌর, রূপে ভাবিত হয়ে। একই অঙ্গে রাধা ও কৃষ্ণর পে কল্পিত হয়েছেন রাধাকৃষ্ণে লীলান, সরণে গৌরচন্দ্রিকায় চৈতন্যের অনরপেভাবের পদ রচিত হয়ে বাংলা সাহিত্যে নব পদধারার সূচনা করল।

চৈতন্য-জীবন-মহিমা প্রচারে তাঁর জীবনী অবলম্বনে চরিত-সাহিত্যও রচিত হল । দেখা দিলেন বাংলা সাহিত্যের চরিত-সাহিত্য রচয়িতা বৃন্দাবন দাস, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, জয়ানন্দ, লোচন দাস প্রমুখে কবিগণ । মাননুষের জীবনীও যে শ্রেষ্ঠ কাব্য-সাহিত্যে রূপায়িত করা সম্ভব তারই নিদর্শন উপহার দিলেন তাঁরা। শখ, চৈতন্য জীবনী নয়, তাঁর অনচের অদ্বৈত, নিত্যানন্দ প্রমুখের জীবনী অবলম্বনেও সাহিত্য রচিত হয়েছে । এ-সবই চৈতন্যের প্রভাবের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ফল ।

প্রাচীন ও মধ্য যুগের বাঙালী ইতিহাস সম্পর্কে উদাসীন। তাই এই কালপর্বে কাব্য যত রচিত হোক, ইতিহাস নিষ্ঠার পরিচয় তেমন পাওয়া যায় না। কাব্যের মধ্যে প্রসঙ্গত ইতিহাস আলোচনা যতটকে, আছে তা-ই আমাদের সম্বল। চৈতন্য, নিত্যানন্দ, অদ্বৈত অথবা তাঁর পত্নী সীতাদেবীর জীবনী নিয়ে যে চরিত্রসাহিত্য রচিত হয়, তাতে শঙ্খ, ব্যক্তিগত জীবন কথাই নাই, আছে সমসাময়িক ইতিহাস। সে ইতিহাস যেমন সমকালীন বৈষ্ণব সমাজের, তেমনি বাঙালী সমাজেরও। চৈতন্যের আবির্ভাবের ফলশ্রুতিতেই তা লাভ করা গিয়েছিল।

প্রাক-চৈতন্যয,গের কবিদের রচনায় বাংলাভাষার বিশিষ্ট রূপটি ফুটে উঠেছিল, কিন্তু তার সাহায্যে মহৎ কাব্যসৃষ্টি সম্ভব হয়নি। তাকে শিষ্ট সাহিত্যের উপযোগী করা গেল চৈতন্যের আবির্ভাবের ফলে। কতে যা ছিল গ্রামীণ সাহিত্যে সীমাবদ্ধ, চৈতন্যের প্রভাবে তা চিরকালীন সাহিত্যে রূপান্তরিত হল। পরাতন সাহিত্যশরীরে নব লাবণ্য, নবীন চিরায়ত সাহিত্যসৃষ্টি, সাহিত্যের নানা শাখার উদ্বোধন ও বিকাশ, চৈতন্যের অন,পম চরিত্র ও তাঁর প্রবর্তিত ধর্মকে আশ্রয় করেই দেখা দিয়েছিল।

চৈতন্যের আবির্ভাব ও প্রভাবে বাংলা ভাষারই শব্দে, শ্রীবৃদ্ধি ঘটেনি, ব্রজব্দ লি নামক একটি কৃত্রিম ললিত ভাষারও বিকাশ ঘটেছে। মিথিলা প্রত্যাগত শিক্ষিত বাঙালীর দ্বারাই তার সদৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু চৈতন্য-পরবর্তী বৈষ্ণব কবিদের হাতে ঘটে তার বিকাশ ।

Comments

Popular posts from this blog

30,000 এর মধ্যে পারফর্মেন্স ও কনফিগারেশন অনুযায়ী কোন ব্রান্ডের ল্যাপটপ ভালো হতে পারে?

সূর্য | পৃথিবী সম্পর্কে প্রশ্ন উত্তর

রোবট আবিস্কার করেন কে.?